অন্যায় ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক আপসহীন কণ্ঠস্বর: ছাত্রনেতা আনোয়ার পারভেজের ১৭ বছরের রক্তস্নাত সংগ্রাম
বিশেষ প্রতিবেদক
মোঃ আনোয়ার হোসেন
সহ-সম্পাদক
Bogura vision 24
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বর থেকে শুরু করে রাজপথের তপ্ত পিচ—যেখানে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের রক্তচক্ষু ছিল, সেখানেই প্রতিরোধের দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছেন আনোয়ার পারভেজ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী এবং বর্তমানে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের অন্যতম সহ-সভাপতি। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই, রাজপথের নির্যাতন, কারাবরণ, করোনা মহামারিতে মানবিক ভূমিকা এবং চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের সম্মুখ সমরে তার বীরত্বপূর্ণ অবদান তাকে দেশের ছাত্র রাজনীতির অন্যতম এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
## ১৭ বছরের দীর্ঘ লড়াই ও ফ্যাসিবাদের রক্তচক্ষু
২০০৮ সালের পর থেকে বাংলাদেশে জেঁকে বসা ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্রদল যখনই রাজপথে নেমেছে, আনোয়ার পারভেজ ছিলেন প্রথম সারিতে। দীর্ঘ ১৭ বছরের এই কন্টকাকীর্ণ পথ চলায় তিনি অসংখ্যবার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে একের পর এক মিথ্যা ও গায়েবি মামলা। কিন্তু পুলিশি নির্যাতন, গোয়েন্দা নজরদারি কিংবা কারাগারে বন্দি জীবন—কোনো কিছুই তার আদর্শ ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইকে স্তব্ধ করতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসকে যখন ছাত্রলীগ নামক ফ্যাসিবাদের পেটোয়া বাহিনী সাধারণ শিক্ষার্থীদের অবরুদ্ধ করে রেখেছিল, তখনো আনোয়ার পারভেজ সাধারণ ছাত্রদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ছায়ার মতো পাশে ছিলেন।
## ২০২৪-এর ডামি নির্বাচন ও রাজপথের প্রতিরোধ
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের একতরফা ‘ডামি নির্বাচন’ বর্জনের আন্দোলনে আনোয়ার পারভেজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এই প্রহসনের নির্বাচনকে প্রতিহত করতে এবং জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি সফল করতে তিনি দিনরাত কাজ করেছেন। সরকারের কঠোর দমন-পীড়ন ও গ্রেপ্তার অভিযানের মধ্যেও সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে রাজপথে লিফলেট বিতরণ, ঝটিকা মিছিল ও অবরোধ কর্মসূচি সফল করার পেছনে তার সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল প্রশংসনীয়। ফ্যাসিবাদের পাতানো ফাঁদে পা না দিয়ে তিনি আপসহীনভাবে গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নেন।
## করোনা মহামারির মানবিক যোদ্ধা
আনোয়ার পারভেজ কেবল রাজপথের লড়াকু সৈনিকই নন, সংকটে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানো এক মানবিক প্রাণ। ২০২০ সালে যখন করোনা মহামারিতে পুরো দেশ স্তব্ধ, মানুষ ঘরবন্দি এবং চারদিকে অক্সিজেনের হাহাকার, তখন নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের সেবায় নেমে পড়েন। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের পক্ষ থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দুস্থ ও অসহায় মানুষের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার পৌঁছানো এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের দোরগোড়ায় গোপনে ত্রাণের ব্যবস্থা করার কাজে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সাধারণ মানুষের প্রতিটি সংকটে ছাত্র রাজনীতির মানবিক রূপটি ফুটিয়ে তুলেছিলেন এই ছাত্রনেতা।
## চব্বিশের জুলাই বিপ্লব: মৃত্যুর মুখোমুখি সম্মুখ সমর
২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশের ইতিহাসে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে (জুলাই আন্দোলন) আনোয়ার পারভেজ এক অবিনাশী বীরের ভূমিকা পালন করেন। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে শেখ হাসিনার পতন নিশ্চিত করার এক দফা আন্দোলনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, শাহবাগ এবং পল্টন-প্রেসক্লাব মোড়ে শিক্ষার্থীদের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের ক্যাডার বাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্বিচার গুলি, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেডের মুখে বুক চিতিয়ে লড়াই করেছেন। আন্দোলন চলাকালীন সময়ে সম্মুখ সমরে থেকে তিনি একাধিকবার মারাত্মকভাবে আহত হন, তবুও দমে যাননি। এই চব্বিশের বিপ্লব সফল করতে এবং স্বৈরাচারের পতন নিশ্চিত করতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে তার এই আত্মত্যাগ ও বীরত্ব ছাত্রদলের ইতিহাসে এক সোনালী অধ্যায় হিসেবে লেখা থাকবে।
## ছাত্র রাজনীতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা
ফ্যাসিবাদ মুক্ত নতুন বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আনোয়ার পারভেজ অত্যন্ত ইতিবাচক ও আধুনিক চিন্তাভাবনা পোষণ করেন। তার মতে, ছাত্র রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।
তার চিন্তাভাবনার মূল দিকগুলো হলো:
* লাঠিয়াল সংস্কৃতির অবসান: ছাত্র রাজনীতিতে কোনো টর্চার সেল, গেস্টরুম কালচার বা জোরপূর্বক মিছিলে নেওয়ার মতো নোংরা সংস্কৃতি আর থাকবে না।
* মেধার মূল্যায়ন: রাজনীতি হবে মেধাভিত্তিক, যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সকল বিদ্যাপীঠে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় থাকবে।
* ছাত্র সংসদ নির্বাচন (ডাকসু): নিয়মিত ডাকসু ও অন্যান্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে প্রকৃত ছাত্র নেতৃত্ব গড়ে ওঠে।
* জনকল্যাণমুখী ছাত্রদল: ছাত্রদলকে তিনি একটি আধুনিক, প্রযুক্তি-বান্ধব এবং মানবিক ছাত্র সংগঠন হিসেবে দেখতে চান, যা দেশের যেকোনো জাতীয় সংকটে সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক হবে।
১৭ বছরের দীর্ঘ লড়াইয়ে পোড় খাওয়া এই তরুণ ছাত্রনেতা বিশ্বাস করেন, জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে হলে তরুণ প্রজন্মকে দেশপ্রেম ও সততার সাথে রাজনীতিতে এগিয়ে আসতে হবে। আনোয়ার পারভেজের মতো ত্যাগী ও মেধাবী নেতৃত্বের হাত ধরেই আগামী দিনে বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতি তার গৌরবময় অতীত ফিরে পাবে—এমনটাই প্রত্যাশা সাধারণ শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।