সংগ্রামের রাজপথে এক নিঃস্বার্থ সহযোদ্ধার নাম—মোঃ মাসুদ রানা ভাই
মোঃ মাসুদ রানা ভাই—গাবতলী উপজেলাধীন সোনারায় ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। বর্তমানে তিনি যমুনা ইলেকট্রনিক্সে ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যাকে ঢাকা শহরের রাজপথে দেখা যেত—তিনি সেই মানুষ। টানা ১৭ বছরের আন্দোলন সংগ্রামে যখনই ঢাকায় যাওয়ার ডাক পড়ত, ঠিক তখনই ফোন আসত মাসুদ ভাইয়ের—
“বিপ্লব, কবে আসবা ঢাকায়? সবাই এসে আমার বাসায় উঠবা। যত লোক আসবে, খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা আমি করবো।”
আমি লজ্জা পেতাম। কারণ মাসুদ ভাই তখন ছোট একটি বাসায় পরিবার নিয়ে থাকতেন। পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৫ জন। কিন্তু তার জোরাজুরি আর ভাবীর অকৃত্রিম ভালোবাসার কাছে সব সংকোচ হার মানত।
আমরা কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডে নেমে ফোন দিতাম। সঙ্গে সঙ্গে তার কোম্পানির দেওয়া ৫ সিটের মাইক্রো নিয়ে হাজির হতেন। অনেক সময় গাদাগাদি করে ৭/৮ জন উঠে মিরপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দিতাম।
তার ছোট্ট সেই বাসায় আমাদের জায়গা করে দিতে তিনি নিজের বেডরুম ছেড়ে দিতেন। ভাবী ও তার তিন কন্যা চলে যেতেন বোনের বাসায়—৩/৪ দিন করে।
ভাবী তিন বেলা রান্না করে রেখে যেতেন। কখনো খাবারের কোনো ঘাটতি হয়নি। আমাদের নিজের সন্তানের মতো আগলে রাখতেন। রাতে কেউ বেডে, কেউ মেঝেতে ঘুমাতাম। সকালে মাসুদ ভাই নিজেই অফিসের গাড়িতে করে আমাদের প্রোগ্রামস্থলে পৌঁছে দিতেন।
বিশেষ করে দুটি দিনের কথা আজও মনে পড়ে—
🔹 ১০ ডিসেম্বর, গোলাপবাগ সমাবেশ
🔹 ২৮ অক্টোবর ২০২৩, ঢাকা মহাসমাবেশ
এই দিনগুলোতে আমাদের জেলা ও উপজেলার অসংখ্য নেতাকর্মীর জন্য তার ছোট বাসায় নিয়মিত খাওয়ার ব্যবস্থা করতেন।
২৪ অক্টোবর ২০২৩ আমরা বগুড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হই। পথে পথে গাড়ি চেক, মোবাইল-ফেসবুক চেক করে অনেক সহযোদ্ধাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছিল। অনেকে ফোন করে সতর্ক করে দিয়েছিল—বাসস্ট্যান্ডে যেন দলবদ্ধভাবে না যাই। আমরা সাবধানে মিরপুরে পৌঁছাই।
২৮ অক্টোবর সকালে মাসুদ ভাই তার ‘যমুনা প্রেস’ লেখা গাড়িতে আমাদের নয়া পল্টনের হোটেল একাত্তরের সামনে নামিয়ে দেন। দুপুর পর্যন্ত আমরা একসঙ্গেই ছিলাম। ভাই আমাদের জন্য খাবার নিয়ে এসেছিলেন—কিন্তু পরিস্থিতির কারণে কারও ভাগ্যে সেই খাবার জোটেনি।
চারদিকে সাউন্ড গ্রেনেড, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত নয়াপল্টনের বন্দুক মার্কেট এলাকার গলিতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ চলে। আমাদের বগুড়ার নন্দীগ্রাম ও কাহালুর অনেক সহযোদ্ধা সেদিন আহত হন।
বিকেল ৫টার পর ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। তিনি আবার গাড়ি নিয়ে এসে আমাদের বাসায় নিয়ে যান। আহত অনেককে ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেন।
বাসায় পৌঁছে জানতে পারি—
২৯ অক্টোবর ২০২৩ সারাদেশে হরতাল।
কেন্দ্রীয় নির্দেশে সবাইকে নিজ নিজ জেলায় ফিরে যেতে বলা হয়েছে।
পুরো ঢাকা যখন নিস্তব্ধ, কোনো গাড়ি চলাচল নেই—ঠিক সেই সময়ও মাসুদ ভাই নিজ গাড়িতে করে আমাদের আবার কল্যাণপুর পৌঁছে দেন। সেখান থেকে আমরা বাসে করে বগুড়ার পথে রওনা হই।
সেদিন অনেক সহযোদ্ধা গ্রেপ্তার হন। শাহ সুলতান কলেজের সহযোদ্ধা শাকিলকে গ্রেপ্তারের খবর জেনেই আমরা প্রবল আতঙ্ক নিয়ে যাত্রা করি। পুরো পথজুড়ে ছিল গ্রেপ্তার ভয়ের শঙ্কা। বিভিন্ন জায়গায় গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি চলছিল।
আল্লাহর রহমতে আমরা সবাই নিরাপদে বগুড়ায় পৌঁছাতে পেরেছিলাম।
পরদিন সকাল থেকেই বগুড়ায় আওয়ামী লীগ–বিএনপির সংঘর্ষ শুরু হয়…
এই স্মৃতিগুলো শুধু গল্প নয়—এগুলো ত্যাগ, ভালোবাসা আর নিঃস্বার্থ নেতৃত্বের ইতিহাস।
মোঃ মাসুদ রানা ভাই ও তার পরিবার আমাদের কাছে চিরকৃতজ্ঞতার নাম। ✊